বদনজর কিভাবে লাগে এবং বদনজর থেকে মুক্তির আমল জানুন?
নজর দোষ কাটানোর দোয়াবদনজর কম -বেশি সবাইকেই লাগে থাকে। কিন্তু বদনজর কিভাবে লাগে তা অনেকেরই অজানা।
তাছাড়া বদনজর থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায় সেটাও অনেকেই ঠিকমত জানে না।
অনেকেই বদনজরকে বিশ্বাস করে না। হাদিস অনুসারে বদনজর আছে এটা সত্যি।
বদনজর এমন একটি জিনিস যা মানুষকে কবর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। তাই আজকের
আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা আপনাদেরকে জানাতে যাচ্ছি বদনজর কিভাবে লাগে এবং বদনজর
থেকে মুক্তির আমল সম্পর্কে।
ভূমিকাঃ
বদনজর হচ্ছে কুদৃষ্টি, অশুভদৃষ্টি বা হিংসুকের হিংসা দৃষ্টি। যা মানুষের অনেক
ধরনের ক্ষতি করে থাকে। কেউ যদি কুদৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকায় তাহলে আপনার
স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য, সংসারে অশান্তি। এমনকি স্বাস্থ্যহানির মত সমস্যাও হতে পারে।
বর্তমান সমাজে বেশ কিছু লোক আছে যারা মানুষের ভালো কিছু সহ্য করতে পারেনা, তাই
বিভিন্নভাবে তারা বদনজর দিয়ে থাকেন।
এতে করে তাদেরকে নানা বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। আর এসব থেকে মুক্তি পেতে
হলে আমাদেরকে জানতে হবে বদ নজর কিভাবে লাগে সে সম্পর্কে এবং বদনজর থেকে মুক্তির
আমলসমূহ জানতে হবে। তাহলে আমরা বদ নজর থেকে মুক্তি পেতে পারি।
বদনজর কি?
বদনজরকে একটি আধ্যাত্মিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সরাসরি আল্লাহর
ইচ্ছার অধীন। এটি আল্লাহর একটি সৃষ্টি, যা মানুষ থেকে মানুষে প্রভাব বিস্তার
করতে পারে। বদ নজরের কারণে মানুষের সৌন্দর্য নষ্ট হয়, সাফল্যে বাধা পড়ে,
সম্পর্কের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়, এমনকি মানুষের জীবনে জীবিকার
ক্ষতি হতে পারে।
বদনজরের লক্ষণঃ
আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না যে, আমাদেরকে বদনজর লাগছে কিনা। বদনজর লাগার
বিভিন্ন লক্ষণ রয়েছে। নিম্নে সেগুলো দেওয়া হলো-
- হঠাৎ করে শরীর খারাপ লাগা, বিশেষ করে মাথাব্যথা বা ক্লান্তি।
- কোন কারণ ছাড়াই কাজে ব্যর্থতা বা অস্থিরতা।
- কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতা।
- কারণ ছাড়াই স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া- বিবাদ।
- শিশুদের ক্ষেত্রে অস্থিরতা, কান্নাকাটি বা খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি।
- কাজের মধ্যে ব্যর্থতা বা দেরি।
- গৃহে বা পরিবারের মধ্যে অশান্তি বা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটা।
- সুন্দর জিনিসে হঠাৎ করে ক্ষতি হওয়া (যেমন গাছ শুকিয়ে যাওয়া, গৃহপালিত প্রাণী অসুস্থ হওয়া ইত্যাদি)।
বদনজর কি সত্যি আছে?
বদনজর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, বদনজর সত্য। এটি এমন একটি প্রভাব যা
মানুষকে উঁচু স্থান থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। (মুসনাদে আহমদ: ২৪৭৩)
বদনজর বা ঈর্ষার দৃষ্টি একজন মানুষের সাফল্য, সৌন্দর্য, সম্পর্ক এবং জীবনের আরো
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। একটি সুন্দর
সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে, সৌন্দর্য অসুন্দর করতে পারে, ক্যারিয়ার ধ্বংস
করতে পারে এবং এমনকি একটি সাজানো-গোজানো সুখের সংসার নিমিষেই বিষাদে পরিণত করতে
পারে ।
বদনজর কিভাবে লাগে?
বদনজর একটি নেতিবাচক প্রভাব। বিভিন্ন কারণ মানুষকে বদ নজর লেগে থাকে। একেক জনকে
একেকভাবে বদনজর লেগে থাকে। আসুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে বদ নজর লাগে তার কারণ
সমূহ-
নেতিবাচক দৃষ্টির প্রভাবঃ কোন ব্যক্তি যদি কারো সৌন্দর্য সুখ অর্জন দেখে
ঈর্ষা নিতে হয় ঈর্ষান্বিত হয় এবং সেই শক্তি নেতিবাচক বহন করে, তবে ধারণা করা
হয় যে এটি সেই ব্যক্তির উপর বদনজর সৃষ্টি করতে পারে।
যেমন-কারো যদি বাচ্চা সুন্দর হয় আর সেই বাচ্চাকে দেখে কেউ যদি মনে মনে হয়,
তবে এতে শিশুটির ওপর বদ নজরের প্রভাব পরে। ফলে শিশুটি হঠাৎ করে অসুস্থ হয় এবং
কান্নাকাটি করে।
অতিরিক্ত প্রশংসাঃ যদি আপনি কোন এক ব্যক্তিকে এবং তার কোন জিনিসকে
অতিরিক্ত প্রশংসা করেন এবং সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা উল্লেখ না করা হয় (যেমন
"মাশাআল্লাহ" বা "আলহামদুলিল্লাহ" ) বলা না হয় তবে সে ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তির
উপর বদনজর পড়তে পারে।
দুর্বল আত্মার প্রভাবঃ কিছু সংস্কৃতি আছে যেগুলোতে বিশ্বাস করা হয় যে,
কিছু লোকের দৃষ্টিতে বিশেষ শক্তি থাকে যা অন্যদের ক্ষতি করতে পারে।
ঈর্ষা ও নেতিবাচক আবেগঃ কারো ভেতরে থাকা ঈর্ষা কিংবা অনুসূয়া অন্যের
জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া নেতিবাচক চিন্তা ও আবেগ একটি শক্তি
হিসেবে কাজ করে, যা ব্যক্তির আশেপাশে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।
অসতর্ক আচরণঃ অনেকেই আছে মানুষকে দেখানোর জন্য নিজেদের সৌন্দর্য, সাফল্য
বা সম্পদ অতিরিক্তভাবে প্রদর্শন করে। আর এই অসতর্ক আচরণের কারণে অনেক সময়
বদনজর লাগতে পারে।
বদনজর থেকে মুক্তির আমলঃ
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বদনজর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে বদনজরকে (আল-আইন)
একটি বাস্তব প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য
নির্দিষ্ট দোয়া ও আমল শেখানো হয়েছে।
আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) একবারবার কোন এক রোগে আক্রান্ত হলেন।
তখন ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) নবীজি (সা.) -এর কাছে এসে বললেন, হে মুহাম্মদ! আপনি
কি অসুস্থ বোধ করছেন? তিনি বললেন হ্যাঁ। তখন জিব্রাইল (আ.) বললেন-
আরবি:
بِاسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ
نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ.
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরকিকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইয়ু্যিকা, ওয়া মিন
কুল্লি আইনিন ওয়া হাসিদিন আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরকিকা।
অর্থ: আল্লাহর নামে আপনাকে ফুঁ দিচ্ছি; যেসব জিনিস আপনাকে কষ্ট দেয়,
সেসব প্রাণের অনিষ্ট কিংবা হিংসুকদের বদনজর থেকে আল্লাহ আপনাকে শিফা দিন;
আল্লাহর নামে আপনাকে ফুঁ দিচ্ছি। (মুসলিম, হাদিস: ৫৫১২)
এই দোয়াটি পড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বারবার ফুঁ দিন ইনশাল্লাহ আক্রান্ত
ব্যক্তির ধীরে ধীরে বদ নজর কেটে যাবে।
ছোট বাচ্চাদের বদনজর থেকে মুক্তির দোয়াঃ
ছোট বাচ্চাদের বদনজর থেকে রক্ষার জন্য ইসলামের নির্দিষ্ট দোয়া ও আমল শেখানো
হয়েছে । বদনজর থেকে রক্ষা করতে রাসূল (সা.) ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বিভিন্ন
দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন। সেরকম একটি একটি দোয়া এখানে দেওয়া হল। হযরত হাসান ও
হুসাইন (রা.) কে রাসুল (সা.) এই বাক্যগুলো দিয়ে ফুঁ দিতেন -
আরবি:
أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ
وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامَّةٍ
উচ্চারণ: ইউজুুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন
ওয়া হাম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্বাতিন।
অর্থ: আমি তোমাদের উভয়কে আল্লাহর কালামের আশ্রয় রাখতে চাই সব ধরনের
শয়তান হতে, কষ্টদায়ক বস্তু হতে এবং সব ধরনের বদ নজর হতে। (বুখারি, হাদিস:
৩৩৭১)
বদ নজর থেকে বাঁচতে কুরআনি আমলঃ
বদ নজর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সূরা নাস ও সূরা ফালাক এ দুটি সূরা খুবই
গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন সকালে ও রাতে তিনবার করে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে
নিজের ও অন্যের শরীরে ফুঁ দিন।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ' রাসুলুল্লাহ (সূরা ফালাক ও
সূরা নাস অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নিজ ভাষায়) জ্বীন ও বদনজর থেকে আল্লাহর
আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
পরে যখন সূরা দুটি অবতীর্ণ হল তখন ওই সূরা দুটি দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা
করতে লাগলেন এবং অন্যান্য সব পরিহার করলেন।' (তিরমিজি ২০৫৮)
তাছাড়া বদ নজর এবং সব ধরনের শয়তানি প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য আয়তুল কুরসি
(সূরা বাকারা ২:২৫৫) অত্যন্ত কার্যকর। এজন্য সকালে রাতে এবং ঘুমানোর আগে
আয়াতুল কুরসি পড়ুন।
মন্তব্যঃ
উপরে আর্টিকেলে মাধ্যমে আপনারা জানতে জান পেরেছেন বদনজরের ভয়াবহতা সম্পর্কে।
একজন মানুষের জীবনে বদনজরের ভয়াবহতা কঠিন থেকে কঠিনতর হতে পারে। বদ নজর কিভাবে
লাগে এবং বদনজর থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায় এ সম্পর্কে আমরা নবী রাসুলের
শেখানো কিছু আমল তুলে ধরেছি।
আশা করি আপনারা এসব প্রয়োগ করলে বদনজর থেকে খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি পাবেন।
তাছাড়া আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করবেন এবং কিছু আমল
আছে সেগুলো নিয়মিত আমল করবেন। আশা করি আর্টিকেলটির পড়ে বদনজর সম্পর্কে
প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পেরেছেন এবং উপকৃত হয়েছেন।
আর যদি আর্টিকেলটি আপনাদের ভালো লেগে থাকে তাহলে আপনাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
শেয়ার করবেন আর এরকম আর্টিকেল পেতে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করবেন।
সাফান বিডির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url