শবে বরাত কি এবং শবে বরাতের ফজিলত জানুন?
শবে বরাত সম্পর্কে হাদিসশবে বরাত আমাদের মুসলমানদের জীবনে খুবই
তাৎপর্যপূর্ণ একটি রাত। কিন্তু এই রাত সম্পর্কে অনেকের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের
বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে। অনেকে আবার নানা ধরনের বিদআত পালন করে থাকে। যা
আমাদের মুসলমানদের জন্য কখনোই কাম্য নয়।
![]() |
তাই আজকে আর্টিকেলে আমরা আপনাদেরকে শবে বরাত কি, শবে বরাতের ফজিলত এবং শবে বরাতে
কি কি আমল করা যায় সে সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে যাচ্ছি। আজকের
আর্টিকেলটি যদি পুরো মনোযোগ সহকারে পড়েন, তাহলে শবে বরাত নিয়ে আপনাদের মধ্যে আর
কোন ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হবে না।
ভূমিকাঃ
আমাদের মুসলমানদের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাত আছে, যার মধ্যে শবে বরাত
অন্যতম। অনেক মুসলমান আছে যারা শবে বরাতের বিভিন্ন ধরনের বিদআত পালন করে
থাকে,যেমন হালুয়া-রুটি খাওয়া, আতশবাজি, আলোকসজ্জা ইত্যাদি করে থাকে। যা কখনোই
শবে বরাতের পরিপন্থী হতে পারে না।
বিশেষ করে আল্লাহ তাআলা এই রাতে তার সৃষ্টির প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন এবং
তাদেরকে ক্ষমা করে দেন, শুধুমাত্র বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তিদের ছাড়া সবাইকে
ক্ষমা করে দেন। তাই এই রাতে আমাদের বেশি বেশি করে ইস্তেগফার পড়া এবং নফল ইবাদত
করা উচিত আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য।
শবে বরাত কি?
শবে বরাত বা মধ্য রজনী যা আরবি ভাষায় " লাইলাতুল বরাত" নামে পরিচিত, হিজরীর
বর্ষপঞ্জির শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত্রে পালিত হয়। বাংলাদেশসহ
উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে এই রাতটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে উদযাপিত হয়। "শব"
ফারসি শব্দ, যার অর্থ রাত এবং " বরাত" অর্থ মুক্তি বা নাজাত; সুতরাং শবে বরাতের
অর্থ হলো মুক্তির রাত।
হাদীস শরীফে যাকে 'নিসফ শাবান' বা শাবান মাসের মধ্য দিবসে রজনী বলা হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশ, পারস্য সহ পৃথিবীর অনেক দেশের ফারসি, উর্দু, বাংলা, হিন্দিসহ
নানা ভাষায় যা ' শবে বরাত' নামেই অধিক পরিচিত।
শবে বরাত কি হাদিসে আছে?
শবে বরাত ইসলাম ধর্মে একটি বরকতময় রাতের নাম। যে রাতের ফজিলত হাদিসের মাধ্যমে
প্রমাণিত আছে। হাদিসের কথা অনুযায়ী এ রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য গুনাগার
বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন। হাদীস শরীফে এ রাতকে ' লাইলাতুন-নিসফি মিন শাবান'
তথা শাবান মাসের পনেরো তারিখের রাত্রি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
শবেবরাতে রোজা রাখা যাবে কি?
শবে বরাত হলো উপবাসের মাধ্যমে আপনার মন, শরীর এবং আত্মাকে পরিষ্কার করার
উপযুক্ত সময় এবং এই রাতের বর্ধিত আধ্যাত্মিকতার সাথে যুক্ত, সেই দিনে রোজা
রাখা সর্বশক্তিমান এর কাছ রহমত পাওয়ার দেখে আপনার মনোযোগকে শক্তিশালী করার
জন্য ভালো। এ রাতে রোজা রাখার ধরা বাধা কোন নিয়ম নেই, তবে এ মাসে যে কোন দিনে
রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
শবে বরাত কি বিদআত?
শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত সম্পর্কে ইসলামী পন্ডিতের মধ্যে বিভিন্ন মতামত
রয়েছে। কিছু আলেমের মতে, শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে সহিহ হাদিস পাওয়া যায়,
যা এই রাতের গুরুত্ব নির্দেশ করে। তারা উল্লেখ করেন যে, এই রাতে আল্লাহ তা'আলা
তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী
ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করেন।
অন্যদিকে, কিছু আলেমের মতে, শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ ইবাদত বা উদযাপন করা
যেমন-আতশবাজি, আলকসজ্জা, হালুয়া-রুটি ইত্যাদি বিদআত হিসেবে গণ্য করা হয়।
সুতরাং, শবে বরাতের ইবাদত ও উদযাপন সম্পর্কে আলমদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে।
এক্ষেত্রে প্রত্যেক মুসলমানের উচিত কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এবং বিশ্বস্ত
আলেমের পরামর্শ অনুযায়ী আমল করা।
শবে বরাতের আমলঃ
শবে বরাত, যা হিজরী সাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত্রে পালিত হয়, মুসলিম
উম্মাহর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এই রাতটি। তাছাড়া এই রাতে আল্লাহ তাআলা
তার বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত ও ক্ষমা বর্ষণ করে থাকেন। শবে বরাতের আমল
সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই রাতের ইবাদত সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে তার। তাদের মতে,
এই রাতে নির্দিষ্ট কোন ইবাদত বা আমল করার ব্যাপারে সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না
এবং পরবর্তীতে কিছু প্রথা ও রীতি নীতি ইসলামের সংযোজন করা হয়েছে। তবে, যারা এই
রাতে ইবাদত করতে চান তাদের জন্য নিম্ন তো আমলগুলো করা যেতে পারে-
নফল নামাজ আদায়ঃ এই রাতে বেশি বেশি সওয়াব পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত নফল
নামাজ পড়া যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোন রাকাত, সংখ্যা বা বিশেষ পদ্ধতি
সম্পর্কে সহিহ হাদিস উল্লেখ নেই।
কুরআন তেলাওয়াতঃ এই রাতে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর
নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা যেতে পারে।
জিকির ও দোয়াঃ আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহ দিয়ে জিকির করা এবং নিজের ও
সমগ্র উম্মাহর জন্য ক্ষমা ও কল্যাণ প্রার্থনা করা যায় এই রাতে।
তওবা ও ইস্তেগফারঃ নিজের বিগত পাপের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে
ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে পাপ থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা করা যায় এই রাতে।
রোজা রাখাঃ শাবান মাসের ১৫ তারিখে রোজা রাখা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)
হিসেবে গণ্য করা হয়। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
শাবান মাসে নিয়মিত রোজা রাখতেন। তাই এই মাসে রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
মৃতদের জন্য মাগফেরাত করাঃ আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত থেকে বর্ণিত। আমি এক রাতে
রাসূলুল্লাহ (সা.) কাছে না পেয়ে খোঁজ করতে বের হলাম। হঠাৎ দেখলাম, তিনি বাকি
কবরস্থানে আছেন। তিনি বললেন, '(হে আয়েশা) তোমার কি এই আশঙ্কা হয় যে আল্লাহ ও
তাঁর রাসূল তোমার উপর জুলুম করতে পারেন? ' আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমার
ধারণা হলো, আপনি অন্য কোন স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন।'
তিনি বললেন, ' নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা অর্ধ শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে
আসেন এবং কালব গোত্রের ছাগল-ভেড়ার পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে ক্ষমা করে
দেন।' (তিরমিজি; ইবনে মাজাহ: ১৩৮৯)
শবে বরাতের ফজিলতঃ
শবে বরাত বা (লাইলাতুল বরাত) ইসলামিক ক্যালেন্ডার এর শাবান মাসের ১৫ তারিখের
রাত, যা মুসলমানদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলতপূর্ণ রাত। এটি "মাগফিরাতের রাত"
বা "মুক্তির রাত" বা "গুনাহ মাফের রাত" হিসেবে পরিচিত। শবে বরাতের ফজিলত
সম্পর্কে হাদিসে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। নিম্নে সেগুলো দেওয়া হলো-
আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত
দীর্ঘ সেজদা করলেন যে আমার ধারণা হলো. তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন; আমি তখন উঠে তার
পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম এবং তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল; তিনি সেজদা থেকে
উঠলেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি আশঙ্কা
হয়েছে? আমি উত্তরেও করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)!
আপনার দীর্ঘ সেজদা দেখে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা?
নবীজি (সা.) বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর
রাসূলই ভালো জানেন।
তখন নবীজি (সা.) বললেন, এটা হলো অর্ধশাবানে রাত; এ রাতে আল্লাহ তাআলা তার
বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন; ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহ
প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। তার বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন।
(শুআবুল ঈমান, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২)।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) এ রাতে মদিনার
কবরস্থান ' জান্নাতুল বাকি' তে এসে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করতেন। তিনি
আরো বলেন, নবীজি (সা.) তাকে বলেছেন, এ রাতে বনি কালবের ভেড়া বকরির পশমের
(সংখ্যার পরিমাণের) চেয়েও বেশি সংখ্যক গুনাহগারকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।
(তিরমিজি শরিফ, হাদিস: ৭৩৯)
অন্য হাদিসে এসেছে, আতা ইবনে ইয়াসার (রহ.) থেকে বর্ণিত শাবানের ১৫ তম রাত
মৃতদের তালিকা (মৃত্যুর দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতার কাছে) দেওয়া হয়। এমনকি
কোন লোক সফরে বের হয়, অথচ তাকে জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের তালিকায়
স্থানান্তর করা হয়েছে। কেউ বিয়ে করে অথচ তাকে জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের
তালিকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। (মুসান্নাফে আব্দুল রাজ্জাক: ৭৯২৫)
শেষ কথাঃ
আমরা যারা জীবিত আছি প্রত্যেকের জীবনে এই শবে বরাতের রাত্রি আসে। তাই এই রাতে
তাৎপর্য বুঝে আমাদের এবাদত বন্দেগী করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে বেশি বেশি
ক্ষমাপ্রার্থনা চাইতে হবে। তাছাড়া এই আর্টিকেলে আমরা আপনাদের জানিয়েছি এই
রাতে কি কি আমল করতে হবে।
যে আমলগুলো করলে আপনারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা পেতে পারেন এবং আল্লাহর নৈকট্য
লাভ করতে পারেন। আশা করি আর্টিকেলটি পড়ে আপনারা অনেক অনেক উপকৃত হয়েছেন আর যদি
সত্যিই উপকৃত হয়ে থাকেন তাহলে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করবেন।
সাফান বিডির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url